রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৮ পূর্বাহ্ন

আইনি মারপ্যাঁচে বৈধতা হারাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, সংসদ ভবন ॥
জাতীয় সংসদের অনুমোদন না পাওয়ায় আজ শনিবার (১১ এপ্রিল) থেকে বৈধতা হারাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, গণভোট, গুম প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ। সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা শুক্রবার (১০ এপ্রিল) শেষ হওয়ায় এই আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সংসদীয় সমীকরণ ও পরিসংখ্যান
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো সচল রাখতে অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে তা সংসদে পাস করার বাধ্যবাধকতা ছিল। প্রাপ্ত তথ্যমতে:

মোট পাস হওয়া বিল: ৯১টি।

বৈধতা পাওয়া অধ্যাদেশ: ৮৭টি বিলের মাধ্যমে ১১৩টি অধ্যাদেশ।

বাতিল হওয়া অধ্যাদেশ: ৪টি বিলের মাধ্যমে ৭টি অধ্যাদেশ সরাসরি বাতিল করা হয়েছে এবং ১৩টি অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন না করায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে।

বিরোধী দলের তীব্র ক্ষোভ ও ওয়াকআউট
অধ্যাদেশ অনুমোদনের শেষ দিনে সংসদে উত্তাপ ছড়ায়। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য ভঙ্গ করেছে। তিনি বলেন, “সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল সব অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হবে, কিন্তু ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ কৌশলে বাদ রাখা হয়েছে। এছাড়া ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল’ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাসের কথা থাকলেও তাতে সংশোধনী আনা হয়েছে।”

এর প্রতিবাদে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন এবং পরে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেন। বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, জননিরাপত্তা ও গুম প্রতিরোধের মতো স্পর্শকাতর অধ্যাদেশগুলো বাতিল হতে দিয়ে সংসদ তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সরকারের অবস্থান ও ব্যাখ্যা
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনসহ ১৬টি অধ্যাদেশ আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করার লক্ষ্যে বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে। এগুলো পরবর্তীকালে বিরোধী দলের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে সংসদে আনা হবে। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও এই ১৬টি অধ্যাদেশ ভবিষ্যতে উপস্থাপনের আশ্বাস দেন।

যেসব অধ্যাদেশ বাতিল হলো
স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়া ১৩টি: গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা, ভ্যাট ও কাস্টমস সংক্রান্ত সংশোধনী, আয়কর, বেসামরিক বিমান চলাচল, ট্রাভেল এজেন্সি নিবন্ধন, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ।

আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হওয়া ৭টি: সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ এবং মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ।

শেষ দিনে পাস হওয়া বিলসমূহ
অধ্যাদেশ অনুমোদনের শেষ দিনে ২৪টি বিল পাস হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

সর্বসম্মত বিল: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন বিল, সাইবার নিরাপত্তা বিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, অর্থ বিল (২০২৫–২৬) এবং ছয়টি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রংপুর ও মহেশখালী) বিল।

সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস: জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল এবং ব্যাংক রেজোলিউশন বিল।

সংশোধনীসহ পাস: তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিল।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশন আগামী ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com